চাল নিয়ে চলছে চালবাজি ।। ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ

চাল নিয়ে চলছে চালবাজি ।। ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ

।।কামাল উদ্দিন খোকন।।

বিএনএ, ২৩  জুন ২০১৭  : চাল নিয়ে চলছে তেলেসমাতি কারবার সরকার বলছে দেশে চালের কোন সংকট নেই । আর বাস্তব চিএ বলছে ভিন্ন । এক ধরনের  মুনাফালোভী ব্যাবসায়ীরা বন্যার কারন দেখিয়ে চাল মজুদ করে  চালের দাম বাড়িয়ে দিয়ে রাতারাতি কোটি পতি বনে যাচ্ছেন ।এর পরেও

সুখবর নেই চালের বাজারে। পাগলা ঘোড়া ছুটছে তো ছুটছেই। থামানোর কেউ নেই। মিল মালিক ও আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকার কিছুই করছে না। সম্পূর্ণ উদাসীন!

ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় চালের দাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছিল। সে সময় মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকায় উঠেছিল। সরু চালের কেজি বেড়ে হয়েছিল ৫৬ টাকা।

চীনে কমেছে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ; ভিয়েতনাম ও ভারতেও কমেছে। আমার মনে হয়, আবারও সেই ২০০৭-২০০৮ সালের সংকটের মুখে পড়ছি আমরা।

 

৪৬ টাকার নিচে কোনো চাল নেই। একটু ভালো সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে রয়েছেন নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্ত শ্রেণির  মানুষ। সরকারি হিসাব অনুযায়ীই গত এক মাসে সাধারণ মানের মোটা চালের দাম বেড়েছে আট শতাংশের বেশি। আর এক বছরে বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ।

খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, চলতি বছরের বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২০ লক্ষ টন ধান কম উৎপাদন হয়েছে। ফলে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চালের বাজারে সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ধানের উৎপাদন কম হওয়ার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আর কিছু অসাধু মিল মালিক যোগসাজশের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে হঠাৎ চালের দাম বৃদ্ধি করেছে। খাদ্যমন্ত্রী জানান, সরকারের পক্ষ থেকে চালকল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দাম কমাতে তাদের চাপও দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সংকট আছে আমি স্বীকার করি।

মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বেশি খায় বিআর-২৮ এবং পাইজম চাল। এই দুই প্রকারের চালেও দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক। বাজারে এখন প্রতি কেজি বিআর-২৮ চালের কেজি ৫২ থেকে ৫৬ টাকা। আর পাইজম চালের কেজি ৫০ থেকে ৫৪ টাকা। অথচ জানুয়ারিতেও এই দুই প্রকার চালের দাম ছিল ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা। আর গত বছরের এই সময় দাম ছিল ৪০ থেকে ৪২ টাকা। এক বছরে মাঝারি মানের এ চালে দাম বেড়েছে ১৯.৫১ শতাংশ।
চালের এই উচ্চমূল্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। যারা সচ্ছল ও সম্পদশালী, চালের দাম বৃদ্ধিতে হয়তো তাদের গায়ে খুব একটা লাগে না। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও লোকলজ্জার ভয়ে কিছু বলতে পারে না বা কোনো না কোনোভাবে সংসার চালিয়ে নিচ্ছেন।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বাজারে সরু চালের কেজি ছিল ৫৪ থেকে ৫৬ টাকা। এ সপ্তাহে তা ২ টাকা বেড়ে ৫৬ থেকে ৫৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোটা চালের দাম ৪৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৮ টাকা। সব ধরনের চালের দাম গত এক মাসে ৪ থেকে ৮ শতাংশ এবং এক বছরে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশে প্রতি কেজি চালের দাম ১০ টাকা বেশি হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারি খাতে চাল আমদানি কম। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬—এই দুই অর্থবছরে দেশে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে চাল আমদানি হয়েছিল প্রায় ৩০ লাখ টন। ওই সময়ে দেশে চালের দাম ছিল ২৫ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে। আর এখন চালের কেজি ৫০ টাকা ছুঁইছুঁই করলেও গত এক বছরে মাত্র ১ লাখ ২৮ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে।

অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, সরকারি গুদামে সব সময় ৬ থেকে ১০ লাখ টন চাল মজুত থাকা উচিত। কিন্তু দুই বছর ধরে সরকারি চালের মজুত ৬ লাখ টনের নিচে ছিল। তিন মাস ধরে তা ৩ লাখ টনের নিচে। হাওরে ফসল বিপর্যয় ও বোরো ধানে ব্লাস্ট রোগের কারণে সরকারি হিসাবে ১২ লাখ টন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ৪০ থেকে ৫০ লাখ টন। বাজারে চালের ঘাটতির সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা।

 

চালের উৎপাদনের যে হিসাব এফএওর প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে গড়ে ৩ কোটি ৪৫ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। ২০১৬ সালে তা থেকে ২০ লাখ টন উৎপাদন বেড়েছিল। ২০১৭ সালে উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণ ৫০ শতাংশ কমে মাত্র ১০ লাখ টন হয়। ভারতে গত এক বছরে চালের উৎপাদন বেড়েছে ১২ লাখ টন, পাকিস্তানে ২ লাখ টন, থাইল্যান্ডে ৪ লাখ টন এবং ভিয়েতনামে ৩ লাখ টন।

মজুত জানার আইন আছে, প্রয়োগ নেই

২০১১ সালে খাদ্য মন্ত্রণালয় কন্ট্রোল অব এসেনশিয়াল ফুড কমোডিটি অ্যাক্ট সংশোধন ও হালনাগাদ করে। ওই আইন অনুযায়ী খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে দেশের সব চাল, গম, ভোজ্যতেল ও ডালের মজুতের হিসাব পাক্ষিকভাবে দিতে হবে। ওই আইন প্রণয়নের প্রথম দুই বছর খাদ্য মজুতের হিসাব রাখা হয়। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে মজুত রাখার ওই নিয়ম অনিয়মিত হয়ে যায়।

তবে সরকারি গুদামগুলোতে চালের মজুতের হিসাব খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে রয়েছে। এই মজুত প্রতি সপ্তাহে ৫ থেকে ১০ হাজার টন করে কমছে। বর্তমানে সরকারি গুদামে চালের মজুত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার টনে, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। মজুত সংকটের কারণে সরকারের খোলাবাজারে চাল বিক্রিসহ (ওএমএস) বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে চাল বিতরণ বন্ধ রয়েছে।

চলতি বছরের মে মাস থেকে চালের মজুত কমতে থাকায় খাদ্য মন্ত্রণালয় বেসরকারি খাতের মজুতের হিসাব নেওয়ার কাজ শুরু করে। গত সপ্তাহে খাদ্য অধিদপ্তর থেকে বেসরকারি খাতে মজুতের হালনাগাদ তথ্যের হিসাব দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ী ও চালকলমালিকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।#

 

Share