দিনাজপুরে নিম্নাঞ্চল প্লাবিতঃ একজনের মৃত্যু ও রেল চলাচল বন্ধ

দিনাজপুরে নিম্নাঞ্চল প্লাবিতঃ একজনের মৃত্যু ও রেল চলাচল বন্ধ

বিএনএ, দিনাজপুর, ১৩ আগস্টঃ তিন দিনের টানা বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলে জেলার দিনাজপুরে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। দেখা দিয়েছে বন্যার আশংকা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার কয়েক হাজার মানুষ। দেয়াল চাপা পড়ে এক গৃহবধুর মৃত্যু হয়েছে। পাবর্তীপুর-পঞ্চগড় লাইনে রেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফুলবাড়ী-বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সড়ক তিন ফুট পানির নীচে।হিলি স্থল বন্দরে ব্যাহত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। জলাজদ্ধতা আর অতি বর্ষণে সমগ্র জেলা জুড়ে শুরু হয়েছে অচল অব্স্থা । এছাড়াও সদর উপজেলায় ভেঙে গেছে আত্রাই নদীর বাঁধ। জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার রানীগঞ্জে তলিয়ে গেছে দিনাজপুর-ঢাকা মহাসড়ক।

প্রবল বর্ষণে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার পল্লীতে দেয়াল চাপা পড়ে আরোদা রানী দাস (৫০) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। আরোদা রানী দাস, কাহারোল উপজেলার ৬নং রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের নয়াবাদ দাসপাড়া গ্রামের সুধীর চন্দ্র দাসের স্ত্রী বলে জানা গেছে।

রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন,শনিবার সন্ধায় বাড়ীতে কাজ করার সময় হঠাৎ দেয়াল ভেঙ্গে পড়লে চাপা পড়েন আরোদা রানী। এরপর স্থানীয়রা তার মৃতদেহ উদ্ধার করে। প্রবল বর্ষণের ফলে মাটির দেয়াল ভেঙ্গে পড়ে বলে জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হয় টানা এই বর্ষণ । এতে ফসলী জমিসহ নিম্নাঞ্চল প্ল্াবিত হওয়ার পাশাপাশি উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বেড়েছে নদ-নদীর পানি। অনেক স্থানেই সড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার রানীগঞ্জ এলাকায় দিনাজপুর-ঢাকা মহাসড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার ফলে যানচলাচলে বিঘœ ঘটছে। এছাড়াও দিনাজপুর সদর উপজেলার সুন্দরবন এলাকায় আত্রাই নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় আশেপাশের গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে।

দিনাজপুর সদর, বিরল, বোচাগঞ্জ, খানসামা, চিরিরবন্দর, বীরগঞ্জ ও পার্বতীপুর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে বীরগঞ্জে তিস্তা নদীর বাঁধ এলাকা থেকে বেশ কিছু পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে প্রশাসন। এছাড়াও জলাবদ্ধতায় বাড়িঘর প্লাবিত হওয়ায় অনেকে গৃহহীন হয়ে পড়েছে।

এদিকে অব্যাহত বৃষ্টিপাতের ফলে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার শতগ্রাম ইউনিয়নের ৬০টি বাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। প্লাবিত হয়েছে সুজালপুর ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকা। এসব পরিবারের লোকজন গবাদি পশুসহ আসবাবপত্র নিয়ে স্থানীয় বলদিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা এবং সুজালপুর ইউনিয়নের উত্তর মাকড়াই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। বীরগঞ্জের শতগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কেএম কুতুব উদ্দিন জানান, বিষয়টি আমরা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আলম হোসেনকে জানিয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত আশ্রয় নেয়া পরিবারের মাঝে সরকারী বা বেসরকারী ভাবে কোনো প্রকার সাহায্য প্রদান করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানিয়েছেন।
উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. রেজাউল করিম জানান, অব্যাহত বর্ষণের ফলে বিদ্যালয় মাঠে হাঁটু পানি জমে গেছে। কয়েকটি শ্রেণীকক্ষে বৃষ্টির পানি জমে রয়েছে। ফলে শিক্ষক উপস্থিত হলেও শিক্ষার্থী না আসায় শিক্ষাকার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে।
এছাড়াও প্রবল বর্ষণে তলিয়ে গেছে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার আমন ক্ষেত। পুকুর ডুবে যাওয়ায় মাছ পালিয়ে গেছে অনেকের।
দিনাজপুর আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জুর রহমান জানান, দিনাজপুরে গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২১৬ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। যা এ মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। আগামী ২ দিন পর্যন্ত এই বৃষ্টিপাত স্থায়ী হতে পারে।

দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন জানান, দিনাজপুর জেলার নদ-নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। জেলার পূর্ণভবা নদীর পানি ৩৩ দশমিক ১০ সেন্টিমিটার ও আত্রাই নদীর পানি ৩৯ দশমিক ০৫ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। এই দু’টি নদীর পানি বিপদসীমা যথাক্রমে ৩৩ দশমিক ৫০ সেন্টিমিটার ও ৩৯ দশমিক ৬৫ সেন্টিমিটার।

এদিকে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বড়পুুকুরিয়া খনি এলাকার ১০ গ্রামের মানুষ। এ দিকে রেলপথের উপরে দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ায় পার্বতীপুর-পঞ্চগড় রেল পথে ট্রেন চলাচল সাময়িক বন্ধ রয়েছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রী সাধারন।

লালমনিরহাট রেল ডিভিশনের ডিআরএম নাজমুল ইসলাম জানান,  পার্বতীপুর-পঞ্চগড় রেলপথের নয়নীব্রীজ ও কিসমত রেলস্টেশনের মাঝামাঝি নয়নীব্রীজ এলাকায় ৮শ মিটার রেলপথের উপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ায় পার্বতীপুর-সান্তাহার রেল পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পঞ্চগড় রেল স্টেশনে আটকা পড়ে আছে ৮ডাউন মেইল ট্রেনটি। বন্যার পানি সরে না যাওয়া পর্যন্ত ওই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে বলে তিনি জানান।

হাকিমপুর উপজেলার নিম্মাঞ্চলে বন্যার প্লাবিত হওয়ায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়েছে। জন-জীবন স্থবির পয়ে পড়েছে। এদিকে হিলি স্থলবন্দরে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌর এলাকায় সুষ্ঠু ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং রাস্তা উচু না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা হয়ে বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে হিলি স্থলবন্দরের ব্যবসা-বানিজ্যে। এছাড়া নাস্তাগুলি ভাঙ্গ-চোড়া হওয়ায় মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে যানবাহন সহ পথচারীদের।
উপজেলা পরিষদ থেকে বাসষ্ট্যান্ড হয়ে চারমাথা, হাসপাতাল, কলেজ, সোনারপট্টি, স্থানিয় আওয়ামী লীগের অফিস ও পানামা পোর্টের সামনের এসব রাস্তাগুলির উপর দিয়ে ১-২ ফুট পানি প্রবাহিত হচ্ছে। হাকিমপুর ডিগ্রী কলেজ, বাংলাহিলি পাইলট স্কুল এন্ড কলেজ এবং বাসষ্ট্যান্ড ৩-৪ ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার রাস্তা ঘেঁষে ড্রেন নির্মাণ করা হলেও কোনো কাজেই আসছে না।

এছাড়া পৌরসভা এলাকার ধরন্দা, কালিগঞ্জ, চন্ডিপুর, চারমাথা, পালপাড়া, দক্ষিণপাড়া, সিপি থেকে বাজার এলাকার কয়েকশত বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। পানিবন্দী এসব মানুষেরা ঘর ও অফিসের আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিলেও অনেককে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

টানা ৩দিনের বৃষ্টিতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। রাস্তার কার্পেটিং উঠে গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় উল্টে যাচ্ছে পণ্যবাহী ট্রাক। এতে করে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে পথচারিসহ ভূক্তভোগিরা।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম জানান, প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দিনাজপুরের বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যা স্থায়ী হলে আমন ক্ষেতের ক্ষতি হতে পারে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থদের প্রয়োজনীয় সহায়তার চেষ্টা চলছে।
এদিকে জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি শনিবার বিকেলে দিনাজপুর পৌর এলাকার চাউলিয়াপট্রি সাদুঘাট,রামনগর, লালবাগ এলাকায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন।

আরকেসি/এসজিএন

Share