পবিত্র জেরুজালেম কেন গুরুত্বপূর্ণ

পবিত্র জেরুজালেম কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিএনএ, ওয়েব ডেস্ক, ৭ ডিসেম্বর ২০১৭: চার হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীণ শহর জেরুজালেম কেন গুরুত্বপূর্ণ মুসলমান,ইহুদি আর খ্রিস্টানদের নিকট? এমন প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদকরা খুজে পেয়েছেন নানা তথ্য। ১৯৬৭ সালে যুদ্ধের সময় ইসরাইয়েল জর্ডানের কাছ থেকে  জেরুজালেম এর কিছু অংশ দখল করে নেয়। পরে তা সম্প্রসারণ করেছে। অবশ্য আগে থেকে প্যালেস্টাইনরা পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী হিসেবে গণ্য করে আসছে। ইসরাইল ধীরে ধীরে বসতি স্থাপন করে জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা করে।

কিন্ত বিতর্কিত স্থানে রাজধানী স্থাপনে কোন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পাওয়ায় এতদিন তারা তেলআবিবকে রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। বিশেষজ্ঞদের ধারণা ইসরাইল জেরুজালেমকে রাজধানী করতে পারলে তারা এটিকে পৃথিবীর বৃহত্তম পর্যটন নগরী হিসেবে আকৃষ্ট করবে। কারণ এটিতে রয়েছে প্রধান তিন ধর্মের অনুসারীদের ঐতিহ্য। যুক্তরাস্ট্র ছাড়া কোন দেশ তেলআবিবের বাইরে  বিতর্কিত স্থানে দূতাবাস স্থাপনে আগ্রহী নয়।

জেরুজালেম এর ইতিহাসও কম নয়। শান্তি,যুদ্ধ এবং ইবাদতের বা প্রার্থনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী এটি। ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ পবিত্র আল আকসা মসজিদটি পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত।  হযরত মুহাম্মদ(স.) যে স্থান থেকে মেরাজে গমন করে ছিলেন সে জায়গাটি চিহ্নিত রয়েছে ।এখানে রয়েছে হযরত ইব্রাহীম(আ.) স্মৃতি চিহৃ বিদ্যমান।

পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসকারী ফিলিস্তীনীরা এখন ইসরাইলীদের নিকট আরো জিন্মি হয়ে পড়বে। যদিও তারা কোন রকম পৌর সভা ও সংসদীয় আসনের এমপি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না।
জেরুজালেমে রয়েছে ইসরাইলের বিখ্যাত হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়। মুসলমান,ইহুদি ও খ্রীষ্টানদের  সাহিত্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রাচীণ প্রতিষ্টানগুলো  জেরুজালেমে অবস্থিত। ইসরাইলের বিখ্যাত সব শিল্পী এই জেরুজালেমের অধিবাসী। ফিলিস্তিীনীদের জাতীয় নাট্যশালা এখানে রয়েছে। অবশ্য ইসরাইয়েল তাদেরকে সে সব প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অনুমোদন দেয় না।

২০১৬ সালে ৩০ লাখ পর্যটক ইসরাইলে আসেন। তার ৭৮ ভাগই জেরুজালেম ভ্রমন করেছেন। কারণ জেরুজালেম না দেখা ছাড়া ইসরাইল ভ্রমণ বৃথা।

মসজিদুল আকসা (আল-আকসা মসজিদ বা বাইতুল মুকাদ্দাস  নামেও পরিচিত) ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ।জেরুজালেমের পুরনো শহরে এটি অবস্থিত। এটির সাথে একই প্রাঙ্গণে কুব্বাত আস সাখরা, কুব্বাত আস সিলসিলা ও কুব্বাত আন নবী নামক স্থাপনাগুলো অবস্থিত। স্থাপনাগুলো সহ এই পুরো স্থানটিকে হারাম আল শরিফ বলা হয়। এছাড়াও স্থানটি  “টেম্পল মাউন্ট” বলে পরিচত এবং ইহুদি ধর্মে পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত মুহাম্মদ(সাঃ)  মিরাজের রাতে মসজিদুল হারাম থেকে আল-আকসা মসজিদে এসেছিলেন এবং এখান থেকে তিনি ঊর্ধ্বাকাশের দিকে যাত্রা করেন। ইতিহাসবিদ পণ্ডিত ইবনে তাহমিয়ার মতে ,

 

আসলে সুলাইমান(আ.) এর তৈরি সম্পূর্ণ উপাসনার স্থানটির নামই হল মসজিদুল আল-আকসা ।মেরাজ শব্দটির অর্থ উন্নতি বা উর্ধ্বে উঠা।ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত সফরকে ‘ইসরা’ এবং মসজিদুল আকসা হতে আরশে আজিমে (ঊর্ধ্বাকাশ) সফরকে মিরাজ বলা হয়।যে রাতে হযরত মুহাম্মদ(সাঃ)  ঐশ্বরিক উপায়ে ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করেছিলেন এবং স্রষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করেন সেই রাতই হল শবে মেরাজ ।ইসলামে মিরাজের বিশেষ গুরুত্ব আছে, কেননা এই মিরাজের মাধ্যমেই ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের দ্বিতীয় স্তম্ভ অর্থাৎ নামাজ মুসলমানদের জন্য অত্যাবশ্যক  অর্থাৎ (ফরজ) নির্ধারণ করা হয় এবং দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান নির্দিষ্ট করা হয়।

 

কুরআন ও ইসলামি বিবরণ অণুযায়ী আল-আকসা মসজিদে মুহাম্মদ (সা) মিরাজের রাতে ,বিদ্যুৎ ও আলোর চেয়ে দ্রুতগামী বাহন বোরাকে চড়ে এসেছিলেন । মিরাজ শেষে হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) প্রথম বাইতুল মুক্কাদ্দিসে অবতরণ করেন। সেখান থেকে বোরাকে করে প্রভাতের পূর্বেই মক্কায় পৌঁছেন।

 

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী নবী করিম(সাঃ) এর নবুওয়াত প্রকাশের একাদশ বৎসরের (৬২০ খ্রিষ্টাব্দ) রজব মাসের ২৬ তারিখের দিবাগত রাতে  প্রথমে কাবা শরিফ থেকে জেরুজালেমে অবস্থিত বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসায় গমন করেন । তিনি এখানে নামাজ পড়েন এবং তার পেছনে অন্যান্য নবী রাসুলগণ নামাজ আদায়

অতঃপর তিনি বোরাকে (বিশেষ বাহন) আসীন হয়ে ঊর্ধ্বলোকে গমন করেন।  ঊর্ধ্বাকাশে সিদরাতুল মুনতাহায় তিনি আল্লাহ’র সাক্ষাৎ লাভ করেন। ফেরেশতা জিব্রাইল পুরো যাত্রায় তার সাথে ছিলেন। কুরআন শরিফের সূরা বনী ইসরাঈল এর প্রথম আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে ।

 

মুহাদ্দিসগণ (কুরানের ব্যাখ্যাকারী) এই বিষয়ে একমত যে সম্পূর্ণ উপাসনার স্থানটিই ইসলামের নবী সুলাইমান (আঃ) তৈরি করেছিলেন যা পরবর্তীতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল । মুসলমানরা বিশ্বাস করে , নির্মাণের পর থেকে এটি ঈসা (আঃ) (ইসলামে যিশু) সহ অনেক নবীর দ্বারা এক আল্লাহকে উপাসনার স্থান হিসেবে ব্যাবহৃত হয়ে এসেছে।  এই স্থান মুসলিমদের প্রথম কিবলা (প্রার্থনার দিক)।  হিজরতের পর কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণে কাবা নতুন কিবলা হয়।  বর্তমানে “আল-আকসা” মসজিদ বলতে বোঝায় কিবলি মসজিদ , মারওয়ানি মসজিদ ও বুরাক মসজিদ (৩টির) এর সমন্বয়  যা “হারাম আল শরীফ” এর চার দেয়াল এর মধ্যেই অবস্থিত। খলিফা উমর বর্তমান মসজিদের স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকের যুগে মসজিদটি পুনর্নির্মিত ও সম্প্রসারিত হয়। এই সংস্কার ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে তার পুত্র খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদের শাসনামলে শেষ হয়। ৭৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ভূমিকম্পে মসজিদটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর এটি পুনর্নির্মাণ করেন। পরে তার উত্তরসুরি আল মাহদি এর পুনর্নির্মাণ করেন। ১০৩৩ খ্রিষ্টাব্দে আরেকটি ভূমিকম্পে মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফাতেমীয় খলিফা আলি আজ-জাহির পুনরায় মসজিদটি নির্মাণ করেন যা বর্তমান অবধি টিকে রয়েছে। বিভিন্ন শাসকের সময় মসজিদটিতে অতিরিক্ত অংশ যোগ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে গম্বুজ, আঙ্গিনা, মিম্বর, মিহরাব, অভ্যন্তরীণ কাঠামো। ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করার পর তারা মসজিদটিকে একটি প্রাসাদ এবং একই প্রাঙ্গণে অবস্থিত কুব্বাত আস সাখরাকে গির্জা হিসেবে ব্যবহার করত। সুলতান সালাহউদ্দিন জেরুজালেম পুনরায় জয় করার পর মসজিদ হিসেবে এর ব্যবহার পুনরায় শুরু হয়। আইয়ুবী, মামলুক, উসমানীয়, সুপ্রিম মুসলিম কাউন্সিল ও জর্ডানের তত্ত্বাবধানে এর নানাবিধ সংস্কার করা হয়। বর্তমানে পুরনো শহর ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তবে মসজিদটি জর্ডা‌নি/ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন ইসলামি ওয়াকফের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

জেরুজালেম ইসলামে অন্যতম পবিত্র স্থান। কুরআনের অনেক আয়াতই জেরুজালেমকে নির্দেশ করেছে যার কথা একদম শুরুর দিকের ইসলামি পণ্ডিতরাও বলেছেন । “জেরুজালেম ” এর কথা হাদিসেও অনেকবার উল্লেখ করা হয়েছে ।এখানে অবস্থিত মসজিদুল আকসা ইসলামে তৃতীয় সম্মানিত মসজিদ এবং একথা মধ্যযুগের অনেক লিপিতেও উল্লেখ করা হয়েছে । হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন “একজন লোক ঘরে নামাজ পড়লে একটি নেকি পান, তিনি ওয়াক্তিয়া মসজিদে পড়লে ২৫ গুণ, জুমা মসজিদে পড়লে ৫০০ গুণ, মসজিদে আকসায় পড়লে ৫০ হাজার গুণ, আমার মসজিদে অর্থাৎ মসজিদে নববীতে পড়লে ৫০ হাজার গুণ এবং মসজিদুল হারাম বা কাবার ঘরে পড়লে এক লাখ গুণ সওয়াব পাবেন।

সংগৃহীত

Share