১৩০০তম_সন্ধ্যা

১৩০০তম_সন্ধ্যা

।।আতকিয়া আনিসা।।

বিভাগ-হিসাববিজ্ঞান বিভাগ।

২য় বর্ষ পরিক্ষার্থী।

——————-

দেখতে দেখতে ১৩০০টি সন্ধ্যা কেটে গেলো। আজ সে নেই। আমি ওর সবচেয়ে প্রিয় জায়গাটাতেই বসে আছি। নাহ,জায়গাটা বাইরে কোথাওনা। আমার ঘরেই। সেটা হলো আমাদের লাইব্রেরি রুমটা।

মেয়েটা বই অনেক পছন্দ করতো। কতটা সে নিজেও জানেনা। ওকে বই দিলে কখনো আমাকে ধন্যবাদ দিতোনা। ওর ছলছল চোখই বলে দিতো এ ধন্যবাদের ভাষা সে জানেনা। বিয়ের আগেই ওর শর্ত অনুযায়ী লাইব্রেরিটা গড়তে হয়েছিল। রুমটা আসলে অনেক মনোরম। ও অবশ্য নিজের মত করেই এটা সাজিয়েছিল। দক্ষিণ -পূর্ব দিকের এই রুমটায় দুটো বড় বড় জানালা আর একটা ব্যালকনি আছে। তাই রুমটা সবসময় আলো বাতাসে ভরপুর থাকে। দোতলার এই ব্যালকনিটা থেকে অনেক কিছুই দেখা যায়। খুব দূরে মাঠ পেরিয়ে বড় রাস্তা। মাঠের কোণায় পাশাপাশি দুটো কদম ফুল গাছ। বর্ষা এলেই কদম ফুলে গাছ দুটো ছেয়ে যায়। অদ্ভুত বিষয় হলো দক্ষিণা বাতাসের জন্য এতদূর থেকেও সেই কদম ফুলের ঘ্রাণ পেতাম। মাঝে মাঝে আমি ওকে বলতাম, ” এই, অনি… তোমার গায়ে কদম ফুলের গন্ধ কেন?” ও দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলতো, “আমিতো তোমার গা থেকেই কদম ফুলের গন্ধ পাচ্ছি। তা…..কার সাথে কদম বিনিময় করলে গো?” আমি উত্তরে কিছুই বলতাম না। শুধু চেয়ে থাকতাম অপলক, ওই দুষ্টুমি ভরা চেহারাটার দিকে।

তার বিয়োগের পর এই ১৩০০ সন্ধ্যা আমি খুব কষ্টে কাটিয়েছি। আমি যে বই বা লাইব্রেরি পছন্দ করতাম তা নয়। আমি ওর পছন্দগুলোই পছন্দ করতাম।

মেয়েটা মাঝে মাঝে অনেক অদ্ভুত সব কথা বলতো। ১৩ সংখ্যাটা নাকি ওর জন্য লাকি।আমরা সবাই ১৩কে আনলাকি বলি। কবি-লেখকরাতো আনলাকি থার্টিন (Unlucky Thirteen) নিয়ে অনেক কিছুই লিখেছেন। আর সে বলে কিনা,১৩ লাকি! আজব একটা মেয়ে!..

আমাদের বিয়ের রাতে ও একটা বিশেষ আবদার করেছিল। সেটা হলো আমরা যতদিন একসাথে বাঁচবো ততদিন ১৩০০তম সন্ধ্যাটা স্পেশাল করে রাখবো। এমন অদ্ভুত কথা বিয়ের রাতে শুনে আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না। তাও ওকে বুঝতে না দিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বললাম, “প্রেয়সী, তোমার জন্য অমর করে রাখবো ১৩০০তম সন্ধ্যেটা।”

ও ফিক করে হেসে বলেছিল,”আমার কিন্তু ১৩০০টা গোলাপ ও লাগবে সেদিন।”

“১৩০০ টা গোলাপ! কি করবে তুমি ১৩০০টা গোলাপ দিয়ে?”

“আমি আমার লাইব্রেরিটা সাজাবো..।”

“বাহ,আসতে না আসতেই নিজের লাইব্রেরি বানিয়ে ফেললে? এখনোতো দেখোইনি।”

“দেখিনিতো কি হয়েছে? আমার জন্য যখন ওটা গড়া হয়েছে তখন ওটা আমারই।”..

ও হিসাববিজ্ঞান নিয়ে অনার্স করেছিল। ওর অনার্স শেষ হবার পর আমাদের বিয়ে হয়েছিল। আমি একটা জিনিস এখনো মাথায় ঢুকাতে পারলাম না, হিসাববিজ্ঞানে পড়ে কি করে মানুষ সাহিত্য প্রেমী হয়? কথাটা ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। উত্তরে ও বলেছিল, “দেখো, আমি যখন সাহিত্যের প্রেমে পরি তখন আমি হিসাববিজ্ঞানের ‘হ’ ও বুঝতাম না।” আমি আর কিছু বলিনি। কারন,ওকে আমি বুঝতাম। পড়ালেখায় ও এতটাও ভালো ছিলোনা। মাঝামাঝি লেভেলের ছাত্রী ছিল। বস্তুত: আমি ওকে পরীক্ষা ছাড়া পড়তেই দেখতাম না। এমনকি ও ওর পাঠ্যবইগুলো ও লাইব্রেরিতে রাখতোনা। ওর মাস্টার্স পরীক্ষার আগে একদিন জানতে চেয়েছিলাম কি করবে এরপর। ও খুব অবাক হয়ে বলেছিল,” কি করবো মানে? আমি কি কিছুই করিনা? আর ওসব চাকরিবাকরি আমায় দিয়ে হবেনা। তুমিতো করছই।”

আমার চোখ কপালে উঠলো ওর উত্তর শুনে। এই মেয়ে বলে কি! পড়ালেখা শেষ করে মেয়েরা চাকরি করতে কত কি না করে। আর ও? যাহোক, আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”

ওর সহজ সরল উত্তর, “চাকরি করলে আমার লাইব্রেরিটা কষ্ট পাবে।”

কি বলবো আমি এই কথাটা শুনে? হো হো হো করে হেসে উঠে বললাম, “বেশ,, চাকরি করতে চাওনা ভালো কথা। তহলে এবার একটা জ্যান্ত পুতুল নিয়ে আসবো তোমার জন্য। দেখবো, তখন তোমার লাইব্রেরি কে সামলায়?”

কথাটা ও ঠিক মতো হজম করতে পারেনি। লজ্জায় লাল টুকটুকে হয়ে পালিয়ে গেলো আমার সামনে থেকে।..

আমার বিয়ের সাড়ে তিন বছরের মাথায় আমরা ১৩০০তম সন্ধ্যেটা পালন করলাম। আমার মেয়ে অরুনিমার বয়স সবে এগারো মাস তখন। ছোট ছোট পা ফেলে তখন এগুনো শিখছে ও।

সেদিন আমি অনিকে ১৩০০টা গোলাপ দিতে পারিনি। তবে ২০০টা গোলাপ এনেছিলাম। ভেবেছিলাম রাগকুমারী আমার সাথে কথাই বলবেনা। ও রেগে যখন ফোঁস ফোঁস করে দারুন লাগে দেখতে। তাই ওকে রাগকুমারী বলি আমি। ২০০টা গোলাপ দেখে সেদিন ও রাগ করেনি। ওগুলো দিয়েই অদ্ভুত সুন্দর করে লাইব্রেরিটা সাজিয়েছিল। ১৩টা তোড়া বানালো ও, আবার সব তোড়ায় ১৩টা ফুল। বাকি ৩১টা ফুল ছিঁড়ে পুরো রুমে ছিটিয়ে দিয়েছিল।

আমি আর অরুনিমা যখন লাইব্রেরিতে গেলাম, কিছুক্ষণ থমকে ছিলাম। ভাবনায় ছেদ পড়েছিল আমার কোলে থাকা অরুনিমার নড়াচড়ায়। ও নেমে যাওয়ার জন্য উতলা হয়ে উঠেছিল।ওকে কোল থেকে নামিয়ে দিতেই ও একবার ফুলের উপর হাঁটে আবার পড়ে গিয়ে হামাগুড়ি দেয়। আমরা দুজনেই ওকে নিয়ে হাসছিলাম। আমি এতটাই মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম যে কিছু একটা বলা দরকার, কিন্তু কি সেটা তাও খুঁজে পেলামনা।

আমি একটা চকলেট কেক এনেছিলাম,অনির কথামত। তাতে লিখা ছিল, ” HAPPY Anniversary of 1300th NIGHT ”

সেদিন রাতটা আমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। আমার বিয়ের পর এই ১৩শ টা রাত, ১২৯৯টা দিন, ৪টা বসন্ত, ৩টা শীত ৩টা বর্ষা একসাথে কাটিয়েছি। একদিনের জন্যও আলাদা হইনি আমরা। এমনকি বেড়াতে গেলেও রাতটা কোথাও থাকেনি ও। প্রতিটা দিন প্রতিটা রাত কোনোনা কোনো ভাবেই স্পেশাল করে রাখতো পাগলিটা। অথচ সেদিনের সাথে আর কোনো দিনের তুলনা চলেনা। এত ভালোলাগা আরতো লাগেনি কখনো!!..

আমরা আবার অন্য ১০টা কাপলের মত ম্যারেজ এনিভার্সারি পালন করিনি। অনি নিজেই করতে দেয়নি। ও বলতো আমরা ১৩০০ তম সন্ধ্যা পালন করবো। আমি তখনো বুঝতে পারিনি যে আমাদের জীবনে ১৩০০তম সন্ধ্যেটা একবারই।..

আজ ২য় ১৩০০তম সন্ধ্যা। আমি আর আমার মেয়ে ওকে ছাড়াই পালন করছি। ঠিক ওর মত করেই ১৩টা তোড়া বানিয়েছি। প্রতিটাতে ১৩টা গোলাপ। আগের মতই সাজিয়েছি সব। কেকটাও আগের মতই। শুধু একটু তফাত ছিল। তা হলো 2nd 1300th NIGHT..।

আমার অরুনিমার বয়স এখন পাঁচ বছর। মেয়েটা আজ একটুও দুষ্টুমি করছেনা।কেমন শান্ত হয়ে বসে শুধু ওর আম্মুর ছবিটাই দেখছে। আমিও দেখছি। ছবিটা যেন আমাকে বলছে, ” কি এত ভাবছো মাহাদী সাহেব? আমায় মিস করছো খুব!! আমিতো ইচ্ছে করে তোমায় ছেড়ে আসিনি, তাইনা?”..

আমার আজ অভিমান হচ্ছে। খুব বেশি অভিমান। আমিতো কখনো অভিমান করতাম না। বরং ও অভিমান করলে ওকে দেখেই হাসতাম। তারপর, রেগে যখন বুদ হয়ে থাকতো তখন গিয়ে রাগ ভাঙাতাম। আজ আমার অভিমান যেন বাঁধ মানছেনা। অভিমান ভাঙানোর মানুষটাইতো নেই।..

একদিন অনি আমাকে একটা চিরকুট দিয়েছিলো। ঠিক চিরকুট ও নয়। একটা অনুচ্ছেদ এর মত। ওটা আমি একটা বইয়ে রেখেছি। খুব যখন ওকে মিস করি তখন ওটা পড়ি। কোথেকে লিখেছে জিজ্ঞেস করায় বলেছিল ওর প্রিয় বই ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ‘অগ্নিপুরুষ’ গল্প থেকে।

লিখাটা এরকম,

“” এক সময় থেমে যাবে সমস্ত কোলাহল, ঘুমিয়ে পড়বে ধরনী।

আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটা মিটমিট করলে বুঝবে… আমি তোমায় ডাকছি।

সে রাতে তুমি জেগে থেকো, বন্ধু, ঘুমিয়ে পোড়োনা।

আর হ্যাঁ, ফুলের গন্ধ পেলে বুঝে নিও আমি আসছি।

আর যদি কোকিল ডাকে, ভেবো আমি আর বেশি দূরে নেই।

তারপর…….হঠাৎ ফুরফুরে বাতাস এসে তোমার গায়ে লুটিয়ে পড়লে বুঝবে,, আমি এসেছি।

সে রাতে তুমি জেগে থেকো,

বন্ধু…….ঘুমিয়ে পোড়োনা।””

..নাহ! আমি ঘুমাইনি। অনি চলে যাওয়ার পর আমি খুব কমই ঘুমিয়েছি।..

বাইরে খুব ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। প্রকৃতি যেন আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরেই করুণ সুরে কাঁদছে। আমি অরুনিমাকে নিয়ে বারান্দায় এলাম। গোলাপের গন্ধ ছাপিয়ে আরেকটা মোহিত গন্ধ নাকে এসে লাগছে। দূরের গাছ দুটি বাতাস কে দিয়ে এই ঘ্রাণটা পাঠাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে যেন আমার বিয়ের ২য় ১৩০০তম রাতের উপঢৌকন এটা।

…. অরুনিমা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো, “স্মেলটা কিসের, বাবা?”

আমি চোখ বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বললাম, ” এটা তোমার আম্মুর গায়ের স্মেল,, মামনি।”

Share