শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০৭:২২ পূর্বাহ্ন

আইয়ুব বাচ্চু চিরনিদ্রায় শায়িত


।।মুহাম্মদ মহরম হোসাইন।।

বিএনএ,চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের গিটার পাগল ছেলেটিই সারাদেশ জয় করে ফিরলেন নিজ নিড়ে। ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও কখনো কখনো ঢাকা থেকে একা গাড়ি চালিয়ে চলে আসতেন তার স্মৃতিবিজড়িত চট্টগ্রামে। কেননা এই চট্টগ্রামেই তার জন্ম। এখানে তিনি বেড়ে উঠেছেন। সেই ব্যস্ততার অবসান ঘটিয়ে গানের মতোই সত্যিই জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা সঙ্গীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু শেষ ঠিকানা হলো সাড়ে তিন হাত মাটি। নিজের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরির চৈতন্যগলি কবরস্থানের শহর কুতুব মাওলানা নজির শাহ আল মাইজভাণ্ডারীর মাজারের উত্তরে মা নূরজাহান বেগমের কবরের বাম পাশে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে আইয়ুব বাচ্চুকে।

এর আগে আছর নামাজ শেষে জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদে প্রাঙ্গণে জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পীর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আলহাজ্ব আ.জম নাছির, মহানগর আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দীন চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান, মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা: শাহাদাত হোসেন, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, জাতীয় পাটির মহানগর সভাপতি সোলাইমান আলম শেঠ, আইয়ুব বাচ্চুর বাবা মো. ইসহাক সহ সমাজের গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

শনিবার সকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধান ঢাকা থেকে তার মরদেহ শনিবার সকালে চট্টগ্রামে আনা হয়। এরপর তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মাদারবাড়ি এলাকায় তার নানাবাড়িতে। বাদ আছর নগরির দামপাড়াস্থ জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদে জানাজা শেষে চৈতন্যগলি কবরস্থানে মায়ের পাশে দাফন করা হয়।

জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদে আইয়ুব বাচ্চু’র মরদেহ আনা হলে হাজার হাজার ভক্ত, অনুরক্তরা ফুল দিয়ে তাদের প্রিয় শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। সেই সময়ে তার অনেক ভক্তের চোখে দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। কেউ হাউমাউ করে কাঁদেন।

 

এদিকে জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর মৃতদেহ দেখে ভেঙে পড়েছেন বন্ধু-সতীর্থ ও শোভাকাঙ্খিরা। সুরের জাদুকর এত তাড়াতাড়ি হারিয়ে যাবেন ভাবতে পারছেন না তারা। কান্না জড়িত কণ্ঠে বাচ্চুর কয়েকজন বন্ধু বলেন, রুপালী গীটার ফেলে সত্যি চলে গেল বন্ধু বাচ্চু, তারা বলেন, আমাদের আড্ডার প্রাণই ছিল তার গিটারের টুংটাং শব্দ। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করতাম। আর বাহবা দিতাম। বলতাম তুই একদিন দেশ মাতাবি। সত্যিই আমাদের গিটার পাগল বন্ধুটি সারাদেশ জয় করেছেন। আজ সেই বন্ধুটিকে আমরা চিরতরে বিদায় দিতে হচ্ছে। তার মৃত্যুতে বড় অসময়ে থেমে গেলো একটি জাদুকরী কণ্ঠ।

জমিয়াতুল জাতিয় মসজিদে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন জানান, জনপ্রিয় সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান। তিনি আমাদের গর্ব ও অহংকার। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কৃতি এই সন্তানের শেষ যাত্রায় শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন করতে পেরে গর্ববোধ করছে।

আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ চট্টগ্রামে আনা, মৃত্যুর ঘোষণা প্রচার, জানাজা এবং দাফন পর্যন্ত পুরো কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।

 

প্রসঙ্গত : ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামের পটিয়ায় জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর জন্ম সরকারী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে গিটারের সাথে সখ্যতা তার।  সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম যোগ দেন স্পাইডার নামে একটি ব্যান্ডের সঙ্গে। সে সময়ে এই গিটার ছিলো তার সঙ্গী। সঙ্গীত জীবন শুরু হয় ১৯৭৮ সালে ফিলিংস ব্যান্ডের সাথে, সেই সময় থেকেই পেশা হিসেবে তিনি সঙ্গীতকেই বেছে নেন। প্রথম গান- হারানো বিকেলের গল্প। আর প্রথম প্রকাশিত একক অ্যালবাম ১৯৮৬ সালে, ‘রক্তগোলাপ’। এই অ্যালবামে তেমন সাড়া না পেলেও দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘ময়না’র মাধ্যমেই সঙ্গীত জীবনের সফলতা শুরু আইয়ুব বাচ্চুর। এর পর ১৯৯১ সালে তিনি এলআরবি ব্যান্ডদল গড়েন। আর এই ব্যান্ডদল থেকেই পান আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা।

রক ঘরানার কন্ঠের অধিকারী হলেও আধুনিক ও ক্লাসিক্যাল গান গেয়েও মুগ্ধ করেছেন শ্রোতাদের।
তারাভরা রাতে, কিংবা উজ্জ্বল সকাল বা মেঘলা বিকেল….বহুদিন এই জাদুকরী কণ্ঠ খুঁজবে বাংলার মানুষ। আশির দশকে বাংলাদেশে ব্যান্ড সঙ্গীতের যে নবযাত্রা… তাতে আইয়ুব বাচ্চু সামনের সারির শিল্পী। তরুণ-যুবকরা আধুনিক ব্যান্ডের ভক্ত হয়েছিলেন তার কণ্ঠেই। তিনি ছিলেন, একাধারে গায়ক, গিটারিষ্ট, গীতিকার, সুরকার, প্লেব্যাক শিল্পী এবং এল আরবি ব্যান্ড দলের লিড গিটারিস্ট।তার ডাক নাম রবিন। তবে, আইযুব বাচ্চু নামেই সুপরিচিত তিনি।

আইয়ুব বাচ্চু শুধু ব্যান্ড জগতেই দাপিয়ে বেড়াননি, ঢাকাই চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবেও তুলেছিলেন আলোড়ন।বাংলা চলচ্চিত্রের গতানুগতিক ধারার গানগুলোর মধ্যে তিনি এনে দিয়েছিলেন তারুণ্যের ছোঁয়া।

বৃহস্পতিবার (১৮ অক্টোবর) মাত্র ৫৬ বছর বয়সে আইয়ুব বাচ্চু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

এই গুনী কণ্ঠশিল্পীর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও  বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।


newssbna-ad
newssbna-ad
ওয়েব সাইটে প্রকাশিত কোন প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও মতামত এর জন্য সম্পাদক কোন ভাবে দায়ী নন